ইংরেজ আমলে মুসিলম সংস্কারকদের ভূমিকা ও বিছিন্ন অঞ্চল হওয়ার পরও মুসলিম প্রধান বাংলাদেশ

১৭৫৭ সালে মুসলিম শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটলে বাংলার ‍মুসলমানদের ওপর ইংরেজ শাসন ও হিন্দু জমিদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় । তখন মুসলমানরা তিন ধরনের আক্রমনের শিকার হতে থাকে । দখলদার ইংরেজদের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চরম আক্রমণ । তাদের তল্পিবাহক হিন্দু এলিটদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগে খ্রিষ্টান মিশনারীদের ব‌্যাপক ধর্মান্তকরণের চেষ্টা । এই বহুমুখী আক্রমণ প্রতিরোধে এগিয়ে আসেন মুসলিম সমাজ সংস্কারকগণ । তন্মধ‌্যে অন‌্যতম হলো –

হাজী শরীয়তুল্লাহঃ  তিনি মুসলিম সমাজ থেকে কুসংস্কার , শিরক, বেদায়াত নির্মূলের জন‌্য ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে ফরায়েজী আন্দোলন শুরু করেন । তাঁর মৃত‌্যুত পর ছেলে  দুদু মিয়া মৃত‌্যু পর্যন্ত (১৮৪০ – ৬২ খ্রি.) এটাকে ইংরেজ প্রতিরোধ আন্দোলনে রূপ দেন ।

মীর নিসার আলী তিতুমীলঃ তিনি ১৮২১ সালে ইংরেজ,হিন্দু জমিদার,নীলকরদের বিরুদ্ধে ব‌্যাপক প্রতিরোধ ও মুসলিম সমাজে আত্মাজাগরণ সৃষ্টিতে গড়ে তোলেন আন্দোলন । অত‌্যাচারী জমিদারদের দমন করে ইংরেজ পেটুয়াবাহিনীকে একাধ্বিার পরাজিত করেন । তিনি ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর নারিকেল বাড়িয়ার বাঁশের কেল্লায় শাহাদাত বরণ করেন ।

মাওলানা কেরামত আলী জৌনপুরীঃ তিনি বাংলা আসামের আনাচে-কানাচে ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করেন । মুসলিম সমাজকে পরাধীনতার হীনমন‌্যতা ও হিন্দু সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে রক্ষা করেন । তিনি মুসলমানদেরকে আবার মুসলমান বানান । তখনকার মুসলিম সমাজ এতটা অধঃপাতে গিয়েছিল যে, পুরুষরা লেংটি ও মেয়েরা গামছা পরত এবং হিন্দু জমিদারদের দেয়া নবজাতকের নামে নাম গিছু , গাছা, পেটা, ফেজু এ ধরনের গ্রহণ করত । মুসলমানরা হিন্দুদের সামাজিক অনুষ্ঠান সবই পালন করত । তিনি ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর প্রচারকার্যক্রম শুরু করেন এবং ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে রংপুরে মৃত‌্যুর পূর্ব পর্যন্ত তা অব‌্যাহত রেখে মুসলিম সমাজের আমূল পরিবর্তন করেন ।

মুন্সী মেহেরুল্লাহঃ খ্রিষ্টান মিশনারীদের অপতৎপরতা রোধে তিনি অবিস্মরণীয় ‍ভূমিকা রাখেন । তাঁর চেষ্টার ফলেই মিশনারীদের কর্মতৎপরতা অনেক কমে যায় এবং মুসলিম সমাজ সতর্ক হতে পারে  ।

বিচ্ছিন্ন অঞ্চল হওয়ার পরও মুসলিম প্রধান বাংলাদেশ

বিশ্বমানচিত্রের মুসলিম অধ‌্যুষিত এলাকাগুলোর মধ‌্যে অন‌্যতম হলো বাংলাদেশ । কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় যে, এর চারপাশে নানা মতালম্বীদের আবাসভূমি হওয়ার পরও কিভাবে বিচ্ছিন্ন এ অঞ্চলটি মুসলিম প্রধানের গৌরব অর্জন করল, তার কারণ হলো: ইসলাম যখন সমগ্র দুনিয়ার মুবাল্লিগ ও মুজাহিদগণের মাধ‌্যমে সম্প্রসারিত হয়েছিল তখন স্থলপথের চেয়ে নৌ –পথই ছিল যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ‌্যম । বাংলার চাটিগাঁ ছিল বাণিজ‌্য জাহাজ বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে শৎগঙ্গ (চট্টগ্রাম) বন্দর হয়ে চীনে দেশে যেত । এ সুবাদে বাণিজ‌্য কাফেলা ও মুবাল্লিগগণ বাংলায় প্রবেশ করে ইসলামের দাওয়াত মানুষের হৃদয় রাজ‌্যে গেঁথে দেন । তাছাড়া রাজনৈতিক বলয়মুক্ত, শান্ত প্রকৃতি ও কোমল স্বভাবের অধিকারী , নৈতিক চরিত্রে খুবই উন্নত এ অঞ্চলের মানুষ ইসলামের দাওয়াত পেশ করার সাথে সাথে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেছিল । ফলে ইসলাম রাজনৈতিক তৎপরতার সমন্বয়ে বিজয়ী রূপ লাভ করে ।