১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গ বিজয়ের পূর্বেই এদেশের অধিবাসীগণ ইসলামের সাথে পরিচিত ছিলেন । আবরদেরকে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে চীনে যেতে হতো । এছাড়াও এ বন্দরের সাথে ইসলাম আগমনের পূর্বেই আরবদের ব‌্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল । আধুনিক গব্ণোয় প্রমাণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা) এর সময় ৬১৭ খ্রিষ্টাব্দে সাহাবী আবু ওয়াক্কাস মালিক (রহ) এর নেতৃত্বে কায়েস ইবনু ছায়রদী , তামীম আনসারী, উরওয়াহ ইবনু আছাছা, আবু কায়েস ইবনু হারিসা (রহ) সহ একটি দল চট্টগ্রামে আসেন । এখানে ইসলাম প্রচার করে কয়েক বছর পর তাঁরা চীনে যান । রাসূল (সা) এর ওফাতের পর যে সকল সাহাবী ভারতীয় উপমহাদেশে দ্বীন প্রচার করতে এসে  বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামে এসে পৌঁছেছেন তাঁরা হলেন :- আব্দুল্লাহ ইবনু উতবান, আসেম উবনু আদী, হাকিম ইবনু আবিল আস সাকাফী (রা) । পরবর্তীতে দু’জন তাবেয়ী মুহাম্মদ মামুন ও মুহাম্মদ মোহায়মেন – এর একটি দলসহ এরূপ পাঁচটি দল বাংলা মুলুকে ইসলাম প্রচার করেন ।

৭১২ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু জয় করলে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের আগমনের পথ সুগম হয় । ৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গোপসাগরে ঝড়ে কবলিত মুসলমানগণ আরাকানে আশ্রায় পায় । ৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে আরকানের মুসলমানগণ পার্শ্ববর্তী (চাটিগাঁও/চট্টগ্রাম) নামক স্থানে বিজয় করেন এবং বাংলায় ইসলাম প্রচারে ব্রতী হন । ১০৫৩ খ্রিষ্টাব্দে শাহ মুহাম্মদ সুলতান বলখী নৌ-পথে ইসলাম প্রচারের জন‌্য মানিকগঞ্জের হরিনামনগর আসেন । পরবর্তীতে বগুড়ার মহাস্থানগড়কে কেন্দ্র করে নিকটবর্তী অঞ্চলে মসজিদ ও ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করে ইসলাম প্রচার করেন । ১১০০ খ্রিষ্টাব্দে একদল মুবাল্লিগ নিয়ে শাহ মুহাম্মদ সুলতান রুমী নেত্রকোনায় আসেন । মদনপুরের রাজার নিকট ইসলামের দাওয়াত দিলে  প্রথমে তিনি বিদ্বেষপোষণ করলেও পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন । ১১৮৪ খ্রিষ্টাব্দে শাহ মাখদূম রূপোশ রাজশাহী অঞ্চলের প্রথম ইসলাম প্রচারক । বঙ্গ বিজয়ের পূর্বে যেসব ইসলাম প্রচারক সম্পূর্ণ বিরোধী পরিবেশ  বাংলায় ইসলামের ভিত গড়ে তুলেছিলেন শাহ মাখদূম ছিলেন তাদের প্রধানতম । তিনি রামপুরের বোয়ালিয়াকে কেন্দ্র করে রাজশাহীকে ইসলামের দুর্গে পরিণত করেন ।

বিভিন্ন অঞ্চলে বিজয়ীবেশে ইসলাম

 

উত্তরবঙ্গ (গৌড়, নদীয়া, বগুড়া, রংপুর , দিনাজপুর): ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খিলজী: পূর্বাঞ্চল (সোনারগাঁও), ঢাকা, ফরিদপুর,ময়মনসিংহ): ১২০৮ খ্রিষ্টাব্দে মুগিসউদ্দিন তুগরীল: সিলেট: ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে শাহজালাল, সেকান্দার গাজী: চট্টগ্রাম: ১৩৪০ খ্রিষ্টাব্দে ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ: খুলনা বিভাগ: ১৪১৮ – ১৪৪৯ খ্রিষ্টাব্দে খান জাহান আল ।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামের প্রচার ও প্রসার :

 

বাংলাদেশের ইসলাম প্রচারে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে । মুসলিম শাসন একাধারে ৫৫৪ বছর চলেছিল ।  তা হলো ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে বখতিয়ার খিলজী বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের সূচনা করেন । তিনি রাজমহল, মালদহ,দিনাজপুর, রাজশাহী , বগুড়া, যশোর ও নদীয়ায় ইসলাম সম্প্রসারণের জন‌্য মসজিদ, ইসলামী শিক্ষালয় স্থাপন ও প্রচারক নিয়োগ করেন । ১২১২ – ২৭ খ্রিষ্টাব্দে হুসাম উদ্দিন খিলজী বহু মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ করেন । তিনি বিশিষ্ট আলেমদেরকে ভাতা প্রদান এবং দরবারে ওয়াজের ব‌্যবস্থা করতেন । ১২৭৮ খ্রিষ্টাব্দে শায়খ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ সোনারগাঁ এসে বসতি স্থাপন করে নির্ভেজাল জ্ঞান বিতরণের জ‌ন‌্য এখানে মাদ্রাসা স্থাপন করেন । ১৩০১ – ০৩ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান ফিরোজ শাহের শাসনাকালে শ্রীহট্টের মুসলিম নিপীড়ক রাজা গৌর গোবিন্দের বিরুদ্ধে সেনাপতি সেকান্দার গাজীর নেতৃত্বে দু’বার ব‌্যর্থ অভিযানের পর হযরত শাহজালালের সহযোগিতায় হিন্দুরাজের পতন হয় । আব্দুল কাদির জিলানীর পৌত্র সায়েদ আহমদ তান্নুরী লক্ষীপুরের কাঞ্চনপুরে ইসলাম প্রচার করেন । বখতিয়ার মাইসুর সন্দ্বীপে ইসলাম প্রচার করেন । ১৩১৩ খ্রিষ্টাব্দে শাহ শফীউদ্দীনের সযোগিতায় জাফরখান সাতগাঁও জয় করেন ১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে লখনৌতির গভর্নর বাহরাম খানের রিসালদার ফখরুদ্দীন ভুলুয়া (নোয়াখালী) , চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুসলিম শাসন সম্প্রসারিত করেন । ১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে হাজী শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ নিষ্ঠাবান মুসলিম হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করা ছাড়াও ইসলাম প্রচারে মুবাল্লিগদেরকে উৎসাহিত করতেন । ১৪৩৯ খ্রিষ্টাব্দে খান জাহান আলী বৃহত্তর খুলনায় ইসলাম প্রচার শুরু করেন । ষাটগম্বুজ মসজিদ তাঁর অমরকীর্তি । তিনি বিভিন্ন স্থানে মসজিদ ও ইসলামী শিক্ষালয় স্থাপন করেন । ১৪৫৯ খ্রিষ্টাব্দে রুকনুদ্দীন বারবক শাহের শাসনামলে আরব দেশে থেকে শাহ তাঁর শাসনামলে ইসলামী বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করেন । জনসাধারণের নৈতিক মনোন্নয়নে মদ‌্যপান নিষিদ্ধ করেন এবং বহু মসজিদ নির্মাণ করেন । ১৫১৬ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামের শাসনকর্তা আলাউদ্দীন শাহ পরাগল খান খলিফাতুল্লাহ, আল্লাহর পথের মুজাহিদ, ইসলাম ও মুসলমানদের সাহায‌্যকারী প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত হন । ১৫৩৬ খ্রিষ্টাব্দে সুলাইমান কররাণী ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম । তিনি সালতানাতে ইসলামী শরীয়াহ বিষয়ক আলোচনা করতেন । ১৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ঈশা খাঁ বার ভূইয়াদের নিয়ে বাতিল ধর্মমতের প্রতিষ্ঠাতা মোঘল সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করে বাংলাকে দ্বীনেএলাহীর প্রভাবমুক্ত রাখেন এবং  ‍দিল্লী থেকে বিতাড়িত প্রতিবাদী মুসলমানদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত করেন । ১৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেব শায়েস্তা খানকে বাঙ্গালার সুবাদার নিযুক্ত করেন । তিনি ঢাকায় এসে পৌঁছে প্রথমে যাকাত, উশর, জায়গীর ইত‌্যাদি সংক্রান্ত অসঙ্গতি দূর করেন । ১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে মুর্শিদকুলি খান বাংলার সুবাদর হয়ে বাংলায় ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন । অনেক মাদ্রাসা,মসজিদ নির্মাণ করেন; ১৭৫৭ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ‌্যমে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে । অপরিণামদর্শী স্বার্থান্ধ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ নেতৃবৃন্দের ভুল সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের ফলে ৫৫৪ বছরের মুসলিম শাসনের অবসান হয়ে ১৯০ বছর ইংরেজদের গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ হতে হয় ।