পলাশীর যুদ্ধ এর কথা আমরা কে না জানি ? বাংলা,বিহার ও উড়িষ‌্যার নবাব সিরাজ –উদ দৌলার পরাজয়ের কাহিনী শ্রবণে আজও হয়তো চোখের কোণ ভিজে যায় অনেকেরই । গুটি কয়েক ইংরেজের ষড়যন্ত্র ও মীরজাফরের মতো । কিছু বিশ্বাসঘাতকের কারণে দেশপ্রেমিক নবাবের মর্মান্তিক পরাজয় ও নির্মম হত‌্যাকাণ্ড এই উপমহাদেশের মানুষের হৃদয়ে এতটাই রেখাপাত করেছিল যে আজাও বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হিসেবে উচ্চারিত হয় মীরজাফরের নাম ।

সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের কাহিনী সবারই জানা । সেটা বর্ণনা করা আমারে উদ্দেশ‌্য নয় । আমি এখানে শুধু সেই ১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের যুদ্ধ ছাড়াই ষড়যন্ত্রের মধ‌্য ‍দিয়ে ক্ষমতা দখলকারী ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ বা লর্ড ক্লাইভের পরবর্তীতে করা একটি মন্তব‌্য উল্লেখ করতে চাই ।

 

তিনি উপহাস করে বলছিলেন, বিজয়ীর বেশে ইংরেজ সেনারা যুদ্ধস্থল ত‌্যাগ করার সময় দুই পাশে যে উৎসুক জনতা দাড়িয়েছিলেন তারা একটি করে ইটের বা পাথরের টুকরো নিক্ষেপ করলেও ইংরেজ বাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত ।

 

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অহঙ্কার ও অর্জন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ‌্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা । একবাক‌্যে সবাই এ কথা স্বীকার করবেন । আর এই যুদ্ধে ভারত কিছুটা সাহায‌্য করেছিল একেবারেই নিজেদের স্বার্থে । তবুও আমরা ভারতের সেই অবদানের জন‌্য আজও কৃতজ্ঞচিত্তে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই । কিন্তু ভারত বাংলাদেশের মানুষের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতাযুদ্ধকে আজও স্বীকার করে না এ নিয়ে আমাদের সামান‌্যতম আফসোস নেই । আমাদের আবেগ ও অংকার ১৯৭১ এর – মুক্তিযুদ্ধকে ভারত আজও পাক-ভারত যুদ্ধ বলে দাবি করছে । কিন্তু এই তথ‌্য আমরা অনেকেই জানি না, জানার চেষ্টাও করি না ।

২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি খবর ছাপা হয়েছিল যার শিরোনাম ছিল “সন্ত্রাস নিয়ে পাকিস্তানকে কড়া বার্তা প্রণবের” । এমন শিরোনাম দেখে যে কারো মনে হবে এটি একান্তই ভারত-পাকিস্তান বিষয়ক একটি খবর । কিন্তু এই সংবাদটির মধ‌্যে দিয়ে স্বাধীনতার এই ৪৫ বছরের মাথায় আরো একবার দিবালোকের মতো পরিস্কার হয়ে গেল যে ভারত বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে আজও মেনে নিতে পারেনি ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাণকেন্দ্র ব্রাসেলসে ইউরোপের এক টেলিভিশন চ‌্যানেলকে দেয়া ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর একটি সাক্ষাৎকার নিয়ে মূলত এই সংবাদটি তৈরি করেছিল আনন্দবাজার । সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের বিভিন্ন সমালোচনার একপর্যায়ে প্রণভ মুখার্জী বলেন, “কিন্তু ভারতের পক্ষে তার সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হয় এমন কোনও সমঝোতা করা সম্ভব নয় আর সীমান্তের ওপার থেকে সন্ত্রাসে মদদ দেওয়া বন্ধ হওয়া প্রয়োজন । শিমলা চুক্তির পরে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে বন্দি ৯১ হাজার পাক সেনাকে ছেড়ে দিয়েছিল ভারত  ।”

প্রণব মুখার্জীর কথায় মনে হচ্ছে যেন ১৯৭১ সালে যুদ্ধ হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তানের মধ‌্যে । অথচ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হলো আমাদের গৌরবগাথা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা । ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ, লাল সবুজের পতাকা । ভারত আমাদের সেই  ‍যুদ্ধে সেনাবাহিনী, আশ্রয় এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায‌্য করেছিল সেটি আমরা সবাই স্বীকার করি । এ জন‌্য অবশ‌্যই আমরা ভারতের কাছে কৃতজ্ঞ ।