১। মোট যুদ্ধ ও অভিযানঃ ১০২ । নিজ পরিচালনায় গাযওয়া : ২৮টি (বড় ৯টি, ছোট ১৯টি ) প্রতিনিধির মাধ‌্যমে (ছারিয়া) : ৭৪  ।

২। অভিযানকাল : ১ম হি: ৩টি (ছারিয়া) । ২য় হি : ১০টি (গাযওয়া -৭, ছারিয়া – ৩ ) । ৩য় হি : ৭টি (গাযওয়া – ৫, ছারিয়া – ২ ) । ৪র্থ হি : ৭টি (গাযওয়া – ২, ছারিয়া – ৫ ) । ৫ম হি : ৬টি (গাযওয়া ) – ৩, ছারিয়া – ১০ ) । ৯ম হি : ১৩ টি (গাযওয়া – ১, ছারিয়া – ১০ ) । ১০ম হি : ১২ টি (ছারিয়া – ১২ ) ।

৩। নিহত শত্রু : ৭৫৯ জন ; বন্দি ৬৫৬৪ জন ।

৪। শহীদ : ২৫৯ জন । আহত : ১২৭ জন । মুসলিম বন্দি ১ জন ।

৫। প্রতিপক্ষ : মক্কার কুরাইশ  ও মিত্র বাহিনী , হাওয়াজিন, সাকীফ, ইহুদি গোত্রত্রয় (কাইনুকা নাযীর ও কুরাইয়া), রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস, পারস‌্য সম্রাট খসরু পারভেজ,  মদিনার মুনাফিক আবদুল্লাহ বিন উবায়ের দল প্রমুখ ।

জিহাদের অনুমতি : হিজরাতের পর প্রতি মুহুর্তেই কুরাইশদের হুমকির মুখে ছিল মদিনার মুসলমানগণ । বাণিজ‌্য পথে মদিনা হওয়ায় কুরাইশরাও মুসলমানদের চরম হুমকি মনে করত । তাই ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংসের জন‌্য এরা বিভিন্নমুখী তৎপরতা চালাতে থাকে । এ প্রেক্ষিতে হিজরতের ৬মাস পর রাসূল (সা) কে জিহাদের অনুমতি দিয়ে অহি নাযিল হয় – ‘যার অত‌্যাচারিত হয়ে আক্রান্ত হয়েছে, তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হচ্ছে । নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাহায‌্য করতে সক্ষম’ । (সূরা হজ; ৩৯)

রাসূল (সা) এর যুদ্ধনীতি : রক্তপাত ঘটানো রাসূল (সা) এর জিহাদের উদ্দেশ‌্য ছিল না । তিনি একান্ত বাধ‌্য হয়েই সংঘর্ষে লিপ্ত হতেন । তিনি কখনও প্রথম আক্রমণ করেননি । শান্তি কামনাই তাঁর একমাত্র উদ্দেশ‌্য ছিল । মক্কা বিজয়ে যাতে কোন ধরনের সংঘর্ষ না ঘটে এজন‌্য সম্পূর্ণ গোপনে অভিযান পরিচালনা করেন এবং সবাইকে ক্ষমা করে দেন ।  তাঁর যুদ্ধনীতিগুলো ছিল –

  • সৈন‌্যদের মধ‌্যে ধর্ম ও নৈতিকতার গুরুত্ব দেয়া ।

  • ব‌্যভিচার ও লুটতরাজ একেবারেই নিষিদ্ধ ছিল ।

  • নামাজ ও অন‌্যান‌্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান সঠিকভাবে পালন করা ।

  •  যুদ্ধলব্দ সম্পদের এক পঞ্চামাংশ গরিবের জন‌্য রক্ষিত থাকত ।

  • যুদ্ধ ছিল মাত্র আত্মরক্ষার্থে ।

  • প্রথম আক্রমণ ছিল নিষিদ্ধ ।

  •  যুদ্ধ হতো অন‌্যায়ের বিরুদ্ধে ন‌্যায়ের জন‌্য ।

  • আল্লাহ মহত্ত্ব প্রকাশের জন‌্য আল্লাহু আকবর ছাড়া আর কোন রণ হুঙ্কার নিষিদ্ধ ছিল ।

  • বিপরীত পক্ষে জয়ে দুর্বল অসহায় লোক ও অসামরিক লোকদের উপর আঘাত এবং পরিবেশ প্রতিবেশের জন‌্য হুমকি এমন ধ্বংসাত্মক কাজ নিষিদ্ধ ছিল ।

  • দূতকে হত‌্যা নিষিদ্ধ চিল ।

  •  আত্মসমর্পণ করলে শত্রুপক্ষকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হতো ।

  • যুদ্ধ চলাকালিন সময় শান্তি প্রস্তাব আসলে তা গ্রহণ করা হতো,  চুক্তি ভঙ্গ নিষিদ্ধ ছিল ।

  • যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত শত্রুদের কবর দেয়া এবং তাদের অঙ্গহানী ও অসম্মান নিষিদ্ধ ছিল । যুদ্ধ বন্দীদের প্রতি সদ্ব‌্যবহার করা হতো ।

রাসূল (সা) এর ব‌্যবহৃত যুদ্ধোউপকরণঃ

৯টি তরবারি,তন্মধ‌্যে জুলফিকার ছিল বিখ‌্যাত , যা পরবর্তীকালে আলী (রা) ব‌্যবহার করতেন । ৭টি বর্ম । ৬টি বর্শা । রূপার বাঁধানো একটি কোমরবন্দ । ৩টি ঢাল । ৫টি নেযা । ২টি শিরস্ত্রাণ । ৩টি লাঠি, তন্মধ‌্যে বিখ‌্যাত মামসূক লাঠিটি চার খলিফাই ব‌্যবহার করেছেন । ৭টি ঘোড়ার নাম জানা যায় । ৪৫ টি উট ।

পথপ্রদর্শকঃ মরুভূমিতে কোন রাস্তাঘাট না থাকায় পথ চেনা খুব কঠিন ছিল । তাই নিরাপদ গমন ও শত্রুর দৃষ্টি এড়িয়ে সংক্ষিপ্ত রাস্তায় গন্তব‌্যে পৌঁছার জন‌্য রাসূল (সা) প্রায় সব অভিযানে পেশাগত পথপদ্রর্শক ব‌্যবহার করেন । তন্মধ‌্যে ১৪ জনের পরিচয় পাওয়া যায় । যেমন – আবদুল্লাহ ইবন উরায়কি (হিজরত), আবু হামজা (উহুদ), মাযকুর (বনু মুস্তালিক), আমর (হুদায়বিয়া), আলকামা (তাবুক) ।

গুপ্তচর (উয়ুন) : মহানবী (সা) প্রায় সকল অভিযানেই গুপ্তচরদের কাজে লাগিয়েছেন । তারা শত্রুদের সামরিক ও সংখ‌্যাগত শক্তি, তাদের কার্যব‌্যবস্থা, পরিকল্পনা, গমনপথ, ঘটনাস্থলের মানচিত্র প্রণয়নসহ শত্রু বাহিনীর গদিবিধি সংক্রান্ত যাবতীয় খবরাখবর সংগ্রহ করত । যতদূর জানা যায় বদরযুদ্ধে প্রথম গুপ্তচর ব‌্যবহার করা হয় । বদরযুদ্ধে তালহা বিন  ‍উবায়দুল্লাহ , সাঈদ বিন যায়েদ , জুহায়নাহ আদী , আম্মার বিন ইয়াসির, আবদুল্লাহ  সাঈদ বিন ; ইহুদ যুদ্ধে আনাস , মুনসী , হুবার ইবনুল মুনিব, আলী বিন আবু তালিব;

খন্দক যুদ্ধে খাওয়াত ইবনে জ্ববায়ের , জুবায়ের ইবনে আওয়াম । হুদায়বিয়ার সন্ধিতে বুশর ইবনে সুফিয়ান , হুনাইনের যুদ্ধে আঃ ইবনে আবি হাদরাদুল আসলামীসহ বিভিন্ন অভিযানে ১৬ জন গুপ্তচরের নাম জানা যায় ।

পতাকা বহনঃ পতাকা বহন আরব সামরিক ঐতিহ‌্যের একটি অংশ ছিল । বিভিন্ন গোত্র আলাদা আলাদা পতাকা বহন করত, যাতে সেনানায়ক পতাকার তলে অবস্থান করতে পারে । রাসূল (সা) এ ঐতিহ‌্য বহাল রাখেন । ছারিয়াতে সাধারণত একজন পতাকাবাহক থাকলেও গাযওয়াতে কয়েকজন থাকতেন । ক্ষুদ্র গাযওয়াতে মুহাজির , খাযরাজ ও আউস গোত্র থেকে ৩জন পতাকাবাহক থাকলেও বড় অভিযানগুলোতে যেমন, মক্কা বিজয়, তাবুক অভিযান সকল গোত্র ও তাদের বিশিষ্ট শাখাসমূহে নিজস্ব পতাকা বহন করে ।

তালিয়াহ/স্কাউট/গোপন পর্যবেক্ষক দলঃ তালিয়াহ ছিল রাসূল (সা) এর পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ‌্যে নিয়োজিত ক্ষুদ্র সেনাদল । ৩ থেকে ২০ জনের গঠিত তালিয়ার কাজ ছিল প্রকাশ‌্য এবং গুপ্তচরেরা গোপনে । তালিয়াদেরকে সেনাবাহিনীর পূর্বেই শত্রু বাহিনীর অবস্থান পর্যবেক্ষণের জন‌্য প্রেরণ করা হতো । বদর যুদ্ধে মুবাইর ইবন আওয়াম, আলী (রা); উহুদ যুদ্ধে মালিক ও নুমান; হুদায়বিয়া ও খাইবার যুদ্ধে আব্বদ বিন বিশর (রা) এর নেতৃত্বে তালিযাহ প্রেরণ করা হয় । আধুনিক স্কাউটের ধারণা এই তালিয়াহ থেকে উদ্ভব ।

দেহরক্ষীঃ সেনানায়ক হিসেবে রাসূল (সা) এর ব‌্যক্তিগত দেহরক্ষী যারা ছিলেন – আব্বাদ ইবন বিশর (প্রধান), আম্মার ইবন ইয়াসির,বেলাল ইবনে রিবা, সা’দ ইবন মুয়ায, সাদ ইবন উবাদাহ (রা) প্রমুখ । মূলতঃ রাসূল (সা) এর নিরাপত্তায় সকল মুসলমান বিশেষ করে আউস ও খাযরাজ গোত্রের লোকেরা দায়িত্ব গ্রহণ করে ।

সন্ধি – সনদ – চুক্তিঃ রাসূল (সা) এর যুগের চুক্তি – সন্ধিগুলো সময় ও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বিভিন্ন ধরন ও প্রকৃতির । এগুলো চারটি যুগে বিভক্ত ।

১ম যুগ: বদর যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত । কুরাইশরা যুদ্ধ ঘোষণা করলে মহানবী (সা) নবীন রাষ্ট্রটির নিরাপত্তাব‌্যবস্থা শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় গোত্রের সাথে বন্ধুত্বমূলক মৈত্রী বা নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার জন‌্য চুক্তি করেন ।

২য় যুগঃ হুদায়বিয়ার সন্ধি- যার মাধ‌্যমে মদিনার রাষ্ট্র আরবের মধ‌্যে একক শক্তিতে পরিণত হয় ।

৩য় যুগঃ হুদায়বিয়ার সন্ধির পর থেকে মক্কা বিজয় পর্যন্ত সময়কালে । এ যুগের চুক্তিগুলো ছিল মুসলমানদের পক্ষে থেকে পরাজিত সম্প্রদায়কে সুযোগ বা নিরাপত্তা দান ।

৪র্থ যুগঃ মক্কা বিজয়ের পর যখন সমগ্র আরব ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হলো তখন পরাজিত গোত্র জিজিয়ার বিনিময়ে স্বীয় ধর্মে থাকার অধিকার লাভের চুক্তি করত ।