বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের মূলে ভাষা আন্দোলনের অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে ।  ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানি জাতিয়তাবাদের পরিবর্তে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটে । পূর্ববাংলার জনগণের স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপই ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন । এ আন্দোলনের মাধ‌্যমে বাঙালি জাতি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকৈ বাধ‌্য করে । রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দেওয়ার ভাষা আন্দোলন সারা বিশ্বের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে  ।

পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয় । ফলে বাঙালি জনগণ বিশেষ করে ছাত্র ও যুবসম্প্রদায় বাংলা ভাষা, সাহিত‌্য ও সংস্কৃতি রক্ষার জন‌্য ঐক‌্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করে । এটিই ‘ভাষা আন্দোলন’ নামে খ‌্যাত । ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলা ভাষা সম্পর্কে সাবেক পাকিস্তান গণপরিষদ ও সরকারি দলের বাংলা ভাষা বিরোধী সিদ্ধান্ত এবং কার্যকলাপের ফলে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয় । ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা  সংগ্রাম পরিষদের ঘোষিত প্রতিবাদ দিবসে এ আন্দোলন তীব্রতার হয়ে উঠে এবং  ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এ আন্দোলন বৈপ্লবিক আকার ধারণ করে ।

১৯৪৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি  ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন , “উর্দু এবং উর্দই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা  ।” তার এ ঘোষণা ভাষা আন্দোলনের সূচনা করে এবং একে কেন্দ্র করে চারদিকে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় উঠে । ১৯৫০ সালের মূল পরিষদের রিপোর্টে পূর্ববাংলার জনগণের প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং ক্ষমতা বিকেন্দ্রীয়করণের দাবি  ‍উপক্ষো করায় বাঙালি জনগণ এর প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এবং তা প্রত‌্যাখ‌্যান করে । ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানে ঘোষণা করেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ।” এতে সমগ্র পূর্ববাংলার ছাত্রসমাজা রাজপথে নেমে পড়ে । ঢাকা বিশ্ববিদ‌্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এ সময়  অগ্রণী ভূমিকা পালন করে । তারা দেশব‌্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেয় । দেশের জনগণ এ ধর্মঘটের প্রতি সাড়া দেয় । ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন চুড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করে । তৎকালীন সরকার ভাষা আন্দোলনকে দাবিয়ে রাখার জন‌্য ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে । কিন্তু বাংলার দামাল ও নির্ভীক ছাত্রসমাজ সকল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে সংগ্রাম অব‌্যাহত রাখে । ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে পড়ে । সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুসারে ঢাকা বিশ্ববিদ‌্যালয়ের পুরাতন কলাভবন থেকে একটি বিরাট মিছিল নিয়ে তারা সামনে অগ্রসর হয় এবং কিছুদূর যাওয়ার পর বর্বর পাক পুলিশ বাহিনী মিছিলের উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে । ফলে বাংলার দামাল ছেলে বরকত, সালাম, জব্বার, রফিক প্রমুখ ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় । পাকিস্তান সরকারের এ বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে সারা বাংলায় বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠে এবং এক প্রবল ও অপ্রতিরোধ‌্য আন্দোলনের সূত্রপাত হয় । এ আন্দোলনের চাপে পড়ে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে পাকিস্তানের অন‌্যতম রাষ্ট্রভাষা বলে স্বীকৃতি দিতে বাধ‌্য হয় । এভাবে দীর্ঘ সংগ্রাম ও রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যদা লাভ করে ।