২৫ জন নবী ও রাসূলগনের তালিকা

হযরত আদম (আ)

হযরত আদম (আ) কে স্বয়ং আল্লাহপাকের নিদের্শনায় জান্নাতের মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয় । তিনিই প্রথম মানুষ এবং প্রথম নবী । আদম শব্দটির অর্থ পৃথিবা । কেননা পৃথিবীর মাটি থেকে আদমকে (আ) পয়দা করা হয়েছে । পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন – “আল্লাহ আদম (আ) কে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং নির্দেশ দিয়েছেন যে হও আর এমনি সে হয়ে গেল ।” (আল ইমারান, আয়াত: ৫৯) । শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত সকল ধর্মের মানুষ পবিত্র একটি পাহাড়কে আদমের (আ) পাহাড় বলে, যেখানে আদম (আ) পবিত্র জুম্মার দিনে অবতরণ করে পৃথিবীতে মানব সভ‌্যতার সূচনা করেন । পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, “আমি (আল্লাহ) বললাম যে , তোমরা সকলেই এখানে (বেহেশত) থেকে নেমে যাও –।” (বাকারা: ৩৮) । সেই পাহাড়ে আজও আদম (আ) এর পদচিহ্ন কালের সাক্ষী হয়ে আছে । ইংরেজিতে পাহাড়ের সেই শৃঙ্গকে Adams Peak এবং স্থানীয় ভাষায় ‘চুজ’ বলে । আদম (আ) তাঁর সঙ্গীনী হাওয়া (আ) এর অনুসন্ধানে পক প্রণালীর দ্বীপপুঞ্জ অতিক্রম করে তৎকালীন ভারতবর্ষে পক প্রণালীর দ্বীপপুঞ্জসমূহকে বিম্ব মানচিত্রে আজও এডামস’স ব্রীজ বা আদমের সেতু বলা হয় । হাওয়া (আ) আজকের আরবের জিদ্দায় অবতরণ করেন । তিনি হলেন মানবজাতির আদি মাতা, সে হিসেবে তাদে দাদীও বলা যায় । সেখানে থেকেই অবতরণস্থলের নাম দাদী বা আরবিতে জিদ্দাতুন থেকে জিদ্দা রাখা হয়েছে । আদম (আ) ও বিবি ‘জাবালে রহমত’ নামক পাহাড়ে । আদম (আ) এর বংশধরের সংখ‌্যা ছিল চার হাজার ।

 

হযরত ইদ্রিস (আ)

হযরত ইদ্রিস (আ) মিশরের আনাপ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । হিব্রু ও সুরিয়ানি ভাষায় তাঁর নাম খনুক এবং আরবি ভাষায় আখনুক । ইদ্রিস তাঁর লকব । আরবি দরস শব্দ থেকে ইদ্রিস শব্দের উৎপত্তি । তাঁর নবুওয়াত সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “………আর স্মরণ কর এই কিতাবের ইদ্রিস (আ) এর কথা, সে ছিল সত‌্যনিষ্ঠ নবী এবং আমি তাতে উন্নীত করেছিলাম উচ্চ মর্যাদায় ।” (সূরা মারিয়াম : ৫৬-৫৭ আয়াত) তিনি একটি আংটি পরতেন । সেই আংটিতে লিখা ছিল “আল্লাহর প্রতি ঈমানের সহিত ধৈর্য অবলম্বনে বিজয়ের পথ সুগম করে দেয়  ।” তার কোমরবন্ধের ওপর লিখিত ছিল “প্রকৃত ঈদ ফরজসমূহ আদায় করার মধ‌্যে নিহিত । দ্বীনের পূর্ণতা শরিয়তের সাথে সংশ্লিষ্ট আর মানবতার পূর্ণতাই দ্বীনের পূর্ণতা ।” সে সময় ৭২টি ভাষা প্রচলিত ছিল । আল্লাহ তাঁর উপর ৩০টি ছহীফা নাযিল করেন । গ্রীক পণ্ডিতগণ তাঁকে হিপোক্রেটিস বলেন । এই হিপোক্রেটিসই ছিলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক । তিনি সপ্তাহে ৩ দিন লোকদেরকে শিক্ষা দিতেন এবং ৪ দিন বিদেশ সফর করতেন । তিনি কলম আবিস্কার করে সর্বপ্রথম লিখন পদ্ধতি চালু করেন । তাঁর স্মরণীয় বাণী হল, ‘জ্ঞান –বিজ্ঞানই আত্মার জীবন ।’

হযরত নূহ (আ)

হযরত নূহ (আ) ফোরাত ও দজলা নদীর মধ‌্যবর্তী চৌদ্দ হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চলের অধিবাসী সুমেরীয় মূর্তিপূজকদের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত দিতেন । সুমেরীয় মূর্তিপূজকরা নূহ (আ) এর কথায় সাড়া না দিয়ে প্রকাশ‌্যে খোদাদ্রোহিতার লিপ্ত হয় । নূহ (আ) আল্লাহর নির্দেশে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার তকতা দিয়ে বিশাল জাহাজ নির্মাণ করেন । যার প্রতিটি তকতায় এক একজন নবীর নাম লেখা ছিল । নূহ (আ) এর জাহাজের দৈর্ঘ‌্য ছিল ১২০০ হাত, প্রস্থ ছিল ৬০০ হাত । যা ছিল ৩ তলা বিশিষ্ট । ৮০ জন ঈমানদার নারী ও পুরুষ এবং প্রতিটি প্রজাতির এক জোড়া প্রাণী নিয়ে প্লাবনের পূর্বে জাহাজে উঠেছিলিন । খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩২ সালে বর্তমান ইরাকের বর্তমান ইরাকের উর শহরের গুরপাক নামক স্থানকে কেন্দ্র করে সর্বপ্রথম প্লাবন শুরু হয় এবং সবকিছু নিচে তলিয়ে যায় । দীর্ঘ দিন পরে এই নৌকা জুদি পাহাড়ে গিয়ে থামে । জুদি পাহাড় যা নূহ (আ) এবং তাঁর সময়কার প্লাবনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । জুদি পাহাড় আরমেনীয় আরারাত পর্বত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত । এটা ৩৮০০ ফুট উঁচু । জুদি পাহাড় কুর্দিস্থান, তুরস্ক এবং আরমেনিয়া সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত । এই প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন বলে, “ – – হে পৃথিবী , তুমি তোমার পানি গ্রাস করে নাও এবং আকাশ ক্ষান্ত হও । এরপর বন‌্যা প্রশমিত হলো এবং কার্য সমাপ্ত হলো এবং জুদি পাহাড়ে গিয়ে থামল এবং বলা হলো  জালিম সম্প্রদায় দূর হয়ে গেলো ।” (সূরা-হূদ আয়াত: ৪৪) প্লাবনের পর নূহ (আ) এর তিন পুত্র জীবিত ছিলেন । পরবর্তীতে তাঁদের বংশধরগণই পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে ।

 

হযরত হূদ (আ)

হযরত হূদ (আ) আজ থেকে ছয় হাজার বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি নূহ (আ) এর পুত্র শামের বংশধর বনী আদম গোত্রকে আল্লাহর দ্বীনের দিকে আহবান করেন । বর্তমানে তাঁর জন্মস্থানের নাম আহকাব বা উবার নগরী । হূদ (আ) এর কবরস্থান হাজরা মাউতের কাসিরে আহমার অর্থাৎ লাল টিলার চূড়ায় অবস্থিত । আদ জাতির রাজধানী ছিল ইয়ামান । বনী আদ গোত্রকে আমালিকা সম্প্রদায়ও বলা হয় । আল্লাহর নাফরমানীর কারণে আদ জাতিকে তিনি মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “ – – আর আদ সম্প্রদায়, তাদেরকে ধ্বংস করা হয়েছে এক প্রচণ্ড ঝাঞ্জাবায়ু দ্বারা, যা তিনি তাদের ওপর প্রবাহিত করেছিলেন সপ্তরাত্রি ও অষ্টদিবস বিরামহীনভাবে ।” (আল-হাক্কা: ৬ ) আদ শব্দের অর্থ উচ্চ । হূদ (আ) এর সময়কালীন স্বৈরাচারী বাদশা শাদ্দাদকে তিনি দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছিলেন ।

 

 

 

হযরত সালেহ (আ)

আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর পূর্বে ‘হিজর’ নামক স্থানে হযরত সালেহ (আ) জন্মগ্রহণ করেন । হিজাজ ও সিরিয়ার মধ‌্যবর্তী স্থান থেকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত সামুদ জাতির বাসস্থান ছিল । তিনি সাম নবীর বংশীয় সামুদ বাদশার গোত্র সামুদ জাতির নিকট দ্বীনের দাওয়াত দিতেন । তাঁর সময় বিশ্বাসীর সংখা ছিল চার হাজার । সামুদ শব্দের অর্থ স্বল্প পানি ।

এই জাতি পানি সঙ্কটে জর্জরিত ছিল  । আল্লাহ সামুদ জাতির পানি পান করার লক্ষ‌্যে একটি কূপ দান করেছিলেন । সামুদ জাতি সালেহ (আ) এর নিকট যখন মুজেজা দাবি করলো, তখন আল্লাহর হুকুমে পাথুরে পাহাড় থেকে একটি উটনী বের হয়ে তৎক্ষনাৎ প্রসব করতঃ বাচ্চাকে দুধ পান করাতে শুরু করলো । এই মুজেজা দেখে কিছু লোক দ্বীন গ্রহণ করলো আর কিছু লোক নবীকে জাদুকর বলে আখ‌্যা দিল । এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন , “ – –  আমাকে কেউ নিষেধ করেনি তবে শুধু এ করাণে পাঠাইনি যে তাদের লোকরা সে সবকে মিথ‌্যা মনে করে অমান‌্য করেছে, সামুদকে আমি উটনী এনে দিলাম আর তারা তার ওপর জুলুম করল । আমি নিদর্শন তো এ জন‌্যই পাঠাই যে লোকেরা তা দেখে ভয় করবে ।” (বনি ইসরাইল: ৫৯)

সামদু গোত্র খুব শক্তিশালী ছিল । তারা পাহাড় খনন করে বাড়ি –ঘর নির্মান করত । বর্তমানে এলাকাটি সৌদি আরবের ‘ময়দানে সালেহ’ নামে পরিচিত । সামুদ জাতির লোকেরা নিষিদ্ধ উট জবাই করার অপরাধে আল্লাহ তাদেরকে বিকট শব্ধের মাধ‌্যমে ধ্বংস করে দেন ।

 

হযরত ইব্রাহীম (আ)

আল কুরআনে বর্ণিত নবীদের মধ‌্যে হযরত ইব্রাহীম (আ) ষষ্ঠতম । তাঁর পিতা অগ্নিপূজক আজর ছিল নমরুদের মন্ত্রী । ইরাকের নাসিরিয়া থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার এবং বাগদাদ থেকে ৩৯৬ কিলোমিটার দূরে ‘উর’ নামাক স্থান যা প্রাচীন বাবেল শহর নামে পরিচিত । এখানে একটি বিধ্বস্ত দোতলা বাড়ি, যেখানে মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহিম (আ) প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন । ১৯৬৭ সালে এক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে ইব্রাহিম (আ) – এ সময়ে এই নগরীতে ৪০ ফুট উঁচু ১১৮০ টি মন্দির চিল । বাবেল শহরের ম‌্যাকফেলা গুহায় তাঁর কবর রয়েছে । হিট্রিদের কাছ থেকে তিনি গুহাটি ক্রয় করেন । তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরার গর্ভে ইসমাঈল (আ) জন্মগ্রহণ করেন । আল্লাহর নির্দেশে শিশু পুত্রসহ বিবি হাজেরাকে মক্কা উপত‌্যকায় নির্বাসন দান করেন । ইব্রাহীম (আ) ফিলিস্তিনে ফিরে গিয়ে দেখেন সারার গর্ভের হযরত ইসহাক এর জন্ম হয়েছে । ইব্রাহীম (আ) ও ইসমাঈল (আ) সম্মিলিতভাবে কাবাঘর পুনঃনির্মাণ করেন । তাঁর নাম কুরআনের ২৫টি সূরায় ৬৯ বার আল্লাহ উল্লেখ করেছেন । তিনি ১৭৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন । তিনি ছিলেন মুসলিম জাতির পিতা । এছাড়া ইব্রাহিম (আ) – এর বংশে মানবজাতির অস‌্যখ‌্য নেতা জন্মগ্রহণ করেন ।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন “ – – আমি তোমাকে সকল মানুষের নেতা করতে চাই, তিনি ইব্রাহিম (আঃ) বললেন আমার সন্তানদের প্রতিও কি এই ওয়াদ ? তিনি (আল্লাহ) উত্তরে বললেন আমার এ প্রতিশ্রুতি জালিমদের জন‌্য নহে ।” (সূরা বাকারা : ১২৪ ) ইব্রাহিম (আ) – এর সময় রাষ্ট্রপ্রধান ছিল নমরুদ । নমরুদের রাজ‌্য ছিল বাবেল, ইরাক ও কলোনী অঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত । অতঃপর আল্লাহর গজব মশা দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নমরুদ মৃত‌্যুবরণ করে ।

 

হযরত লুত (আ)

লুত শব্দের অর্থ জড়িয়ে যাওয়া, এঁটে যাওয়া । ‍লুত (আ) ইব্রাহিম (আ) – এর একান্ত প্রিয়ভাজন ও অন্তরঙ্গ ছিলেন বলেই তার নাম লুত হয় । প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে লুত (আ) বাবেল শহরে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি ইব্রাহিম (আ) – এর ভাতিজা ছিলেন । তিনি সামুদ গোত্রের নিকট প্রেরিত হন । তাঁর গোত্রের লোকেরা সমকামিতা (Sodomy), বণিকদের সম্পদ লুণ্ঠনসহ যাবতীয় অপকর্মে লিপ্ত থাকত । কুরআনে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে , “তোমরা কি ঐ সমস্ত লোক নও যে তোমরা পুরুষদের সাথে অপকর্ম করছ, ডাকাতি করছ, নিজেদের মজলিসসমূহে এবং পরিবার পরিজনের সম্মুখে অশ্লীল কার্য করছ ।” (সূরা আন কাবুত : ২৯ ) এই সমকামিতার অপরাধে এবং ফেরেশতাদের সাথে খারাপ আচরণের কারণে আল্লাহ সামুদ গোত্রের বস্তিসত জমিনকে উল্টিয়ে দিয়েছেন । এই সাগর ৮৩ কিলোমিটার লম্ব , ১৮ কিলোমিটার প্রস্থ এবং ১০০০ ফুট গভীর । অতিরিক্ত লবণের কারণে পানির ঘনত্ব অত‌্যাধিক বেশি যার ফলে কোন মানুষ পানিতে ডোবে না ।

 

হযরত ইসমাঈল (আ)

ইব্রাহিম (আ) – এর দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরার গর্ভে ইসমাঈল (আ) আজ থেকে প্রায় তিন হাজার নয়শত দশ বছর আগে আজকের ফিলিস্তিনের হেবরুনে জন্মগ্রহণ করেন । ইব্রাহিম (আ) আল্লাহর নির্দেশে শিশু পুত্রসহ বিবি হাজেরাকে মক্কা উপত‌্যকায় নির্বাসন দান করেন  । ইসমাঈল (আ) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন – “আর ইসমাঈল, ইয়াসা, ইউনুস ও লতু – প্রত‌্যেককেই আমি সারাবিশ্বের ওপর গৌরবান্বিত করিছি” । (সূরা আনআম: আয়াত ৮৬)

নির্বাসনের মশকের সঞ্চিত পানি শেষ হওয়ার পর হযরত হাজেরা ছাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ‌্যে পানির সন্ধানে সাতবার সায়ী করেন যা বর্তমানে হজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হঠাৎ হাজেরা (আ) দেখলেন একজন ব‌্যক্তি জিব্রাইল (আ) মাটিতে আঘাত করছেন । অতঃপর পানি বের হওয়া শুরু হলো । হাজেরা (আ) পানি সংগ্রহ করে পাথর দিয়ে বাঁধ দিলেন, যা জমজম কূপ হিসেবে  পরিচিত । জমজম শব্দের অর্থ শক্ত করে বাঁধ দেয়া । ইসমাঈল (আ) ১৩৭ বছর জীবিত ছিলেন ।

হযরত ইসহাক (আ)

ইব্রাহিম (আ) – এর যখন একশো বছর এবং বিবি সারাহ – এর বয়স যখন ৯০ বছর তখন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে একজন সন্তানের শুভ সংবাদ দেন । সে সন্তানের নামই ইসহাক (আঃ) । ইসহাক (আ) – এর দুই’ছেলে, তারা হলেন ইয়াকুব এবং ইশু । তিনি ১৮০ বছর জীবিত ছিলেন এবং কেনানে মৃত‌্যুবরণ করেন ।

 

হযরত ইয়াকুব (আ)

ইয়াকুব (আ) কেনান অর্থাৎ আজকের ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে জন্মগ্রহণ করেন । ইয়াকুব (আ) – এর উপাধি হলো ঈসরাইল । ইব্রানী ভাষায় ইসরা অর্থ গোলাম এবং ‘আইল’ অর্থ আল্লাহ । অর্থাৎ ঈসরাইল অর্থ ‘আল্লাহর বান্দা’ । তাঁর পিতা হযরত ইসহাক (আ) এবং মাতা রহীল বিনতে লাবান । ইয়াকুব (আ) ১২ সন্তানের জনক ছিলেন । রাতবীন, শামাউন, লাওয়া, ইয়াহুদ, দাইসাফার, যালুবুন, ইউসুফ, বেনইয়ামীন, দান, নাফতালা, যাদ ও আষার । বেনইয়ামীনকে ইহুদী নাছারা বেঞ্জামিন এবং ইউসুফ (আ) – কে জোসেফ বিকৃত নামে ডাকে । আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর সম্বন্ধে বলেন ,  – – “এবং আমি ইব্রাহিমকে দান করেছিলাম ইসহাক এবং পৌত্ররূপে ইয়াকুব, আর প্রত‌্যেককেই করেছিলাম সৎ কর্মপরায়ণ ।” (আম্বিয়া: ৭২ ) ইয়াকুব (আ) ১৪৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন এবং ফিলিস্তিনের হেবরুনে তাঁকে দাফন করা হয় ।

 

হযরত ইউসুফ (আ)

ইউসুফ (আ) ছিলেন ইয়াকুব (আ) এর ১১ তম সন্তান । একদা তিনি স্বপ্নে দেখেন ১১টি গ্রহ তাঁকে সিজদা করছে । উক্ত ঘটনা ইয়াকুব (আ) – কে বলেন । ঘটানাক্রমে তাঁর ভাইয়েরা ঘটনাটি জেনে গেলেন । তাঁর ভাইয়েরা তাঁকে Douthan নামক স্থানে এক অন্ধকার কূপে নিক্ষেপ করেছিল । মিশরগামী বাণিজ‌্য কাফেলা কূপের ভেতর বালতি নিক্ষেপ করলেই  ইউসুফ (আ) সেটা ধরে ফেললেন এবং বালতিসহ তিনি উপরে উঠে আসেন তৎক্ষণাৎ তারা এ ফুটফুটে কিশোরকে মিশরের বাজারে নিয়ে গেলে মিশরের বাদশা আজিজ তাঁকে দাস রূপে ক্রয় করে নেন । এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেন, “একটি যাত্রীদল এলো, তারা তাদের পানি সংগ্রাহককে পানি সংগ্রহের জন‌্য পাঠালো । সে তার ডোল নামিয়ে দিল । সে বলে  ‍উঠলো কী সুখবর ! এ যে এক কিশোর অতঃপর তারা তাঁকে পণ‌্যরূপে লুকিয়ে রাখলো । তারা যা করতে ছিল আল্লাহ যেসব বিষয়ে অবহিত ছিলেন” । (সূরা ইউসুফ, আয়াত : ১৯)

এ সময় তাঁর বয়স ছিল ১৩ বছর । আজিজের গৃহে তিনি ৬ বছর অবস্থান করার পর তাঁর স্ত্রী জুলেখা কর্তৃক অপবাদ রটনার প্রেক্ষিতে তিনি কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন । পরে বাদশার দেখা স্বপ্নের ব‌্যাখ‌্যা দেয়ার কারণে তিনি কারামুক্ত হয়ে রাজ‌্যের খাদ‌্য মন্ত্রণালয়েল দায়িত্বে নিয়োজিত হন । অতঃপরই খ্রিষ্টপূর্ব ১৭০৬ অব্দে পিতা এবং পরিবারে অন‌্যান‌্য সদস‌্যসহ রামাসিস নামক স্থানে বসবাস শুরু করেন । ইউসুফ (আ) ১১০ বৎসর বয়সে মিশরে মৃত‌্যুবরণ করেন ।

 

হযরত আইয়ুব (আ)

আইয়ুব (আ) খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০-১৩০০ সনের মধ‌্যে দক্ষিণ আরবের আওজ আইল নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন । পবিত্র কুরআনে তাঁর নবুওয়াত সম্পর্কে উল্লেখ আছে, “আর তাঁর আওলাদের মধ‌্য থেকে দাউদ সুলাইমান , আইয়ুব (আ) আদওয়ান বংশীয় আরব ছিলেন । তাঁর জামানা ছিল ইয়াকুব (আ) এবং মুসা (আ) – এর মধ‌্যবর্তীকালে । তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর অসুস্থ থাকার পর ১৪০ বছর বয়সে রোগ থেকে মুক্তি লাভ করেন । আইয়ুব (আ) ২১০ বছর জীবিত ছিলেন ।

হযরত গুয়াইব (আ)

গুয়াইব (আ) খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ থেকে ৬০০ সালের মধ‌্যে মাদায়েনে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি ইব্রাহিম (আ) – এর ছেলে মাদায়েনের বংশধর । রাসূল (সা) তাঁকে ‘খতিবুল আম্বয়া’ বা নবীদের মাঝে ‘শ্রেষ্ঠ বক্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন । মাদায়েনের জনগণের সুবিধার জন‌্য তিনি একটি কূপ খনন করেন । এই কূপের পানি থেকে জনগণ উপকৃত হত । তিনি মাদায়েন ও আইকা সম্প্রদায়ের নবী হিসেবে দুনিয়ার প্রেরিত হন । মুসা (আ) – এর শ্বশুর ছিলেন গুয়াইব (আ) । মাদায়েনবাসী সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আমি মাদায়েনবাসীদের প্রতি তা দর ভ্রাতা গুয়াইব (আ) কে পাঠিয়েছিলাম । সে বলেছিল , হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর ।” – সূরা আন –কুবত : ৩৬

হযরত মূসা (আ)

মুসা (আ) ৩২০০ বছর পূর্বে মিশরের সিনাই উপত‌্যকায় জন্মগ্রহণ করেন । মুসা শব্দের অর্থ মূশা যার অর্থ নাজাত দানকারী । তিনি বনি ইসরাঈলকে ৪০০ বছরের গোলামী থেকে নাজাত দান করেছিলেন । জন্মের পর থেকে তিনি আল্লাহর কুদরতে ফেরাউন দ্বিতীয় রামাসিসের ঘরে লালিত-পালিত হন । তিনি নবুওয়াতে লাভের পর আল্লাহর নির্দেশে ফেরাউনের নিকট আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে যান । ফেরাউন দাওয়াত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় এবং  মু’জিযা দাবি করলে তিনি তার হাতের লাঠিখানা মাটিতে নিক্ষেপ করেন এবং সাথে সাথে তা বিশাল  অজগরে পরিণত হয় । মু’জিযা প্রত‌্যক্ষ করা সত্ত্বেও দাওয়াত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে মুসা এবং তার অনুসারীদের ওপর জুলুম নির্যাতন করে । খ্রিষ্টপূর্ব ১২৩৫ সালে মূসা (আ) তার সঙ্গী সাথীদেরকে নিয়ে ফিলিস্তিনের উদ্দেশ‌্যে হিজরত করেন । ফেরাউন তার সৈন‌্য সামন্ত নিয়ে মুসা (আ) – এর পশ্চাদ্ধাবন করে লোহিত সাগরের দিগে  রওয়ানা হয় । মুসা (আ) হাতের লাঠি সাগরে নিক্ষেপ করলে বারোটি রাস্তা তৈরি হয় । মুসা (আ) তাঁর সাথীদের নিয়ে সাগর অতিক্রম করেন । কিন্তু ফেরাউন সাগরের মাঝামাঝি আসা মাত্র সঙ্গী সাথীদের সলীল সমাধি ঘটে । মিশরের জাদুঘরে আজও ফেরাউনের লাশ রক্ষিত আছে । মুসা (আ) পাহাড়ে আল্লাহতায়ালার সাথে কথা বলেন এবং নবুওয়াত প্রাপ্ত হন  । আল্লাহ  কুরআনে বলেছেন, “তাকে আমি আহবান করেছিলাম তু পাহাড়ের দক্ষিণ দিক থেকে এবং আমি অন্তরঙ্গ আলাপে তাঁকে নিকটবর্তী করেছিলাম । আমি নিজে অনুগ্রহে তাকে দিলাম তার ভ্রাতা হারুনকে নীবরূপে ।” (মারিয়াম, ৫২ – ৫৩ ) সমুদ্র সমতল থেকে তুর পাহাড়ের উচ্চতা ৮২৬ মিটার  । তূর পাহাড়ে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তাওরাত নামক আসমানী কিতাব প্রাপ্ত হন । সমুদ্র অতিক্রম করে মূসা (আ) বনী ইসরাঈলদের নিয়ে বাইতুল মাকদাস রওয়ানা হন । মরুভুমিতে পানির অভাব হলে হাতের লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করলে আল্লাহর নির্দেমে পানির ১২টি ঝর্ণা প্রবাহিত হতে শুরু করে, যা আজাও প্রবহমান ।

হযরত হারুন (আ)

হারুন (আ) ছিলেন মূসা (আ) – এর ভাই । তিনি ছিলেন ইব্রাহিম (আ) – এর সপ্তম অধঃস্ত পুরুষ । তিনি মূসা (আ) কে সাহায‌্যকারী ও প্রতিনিধি হিসেবে দ্বীনের দায়িত্ব পালন করেন । এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুআনে আল্লাহ বলেন – আমি তো মূসা (আ) কে কিতাবে দিয়েছিলাম এবং তার ভাই হারুনকে তাঁর সাহায‌্যকারী করেছিলাম এবং বলেছিলাম এবং তোমরা সেই সম্প্রদায়ের নিকট যাও যারা আমার নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করেছে । অতঃপর আমি তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করেছিলেম ।” (সূরা আল-ফারকান, ৩৫ – ৩৬ আয়াত) মুসা (আ) যখন চল্লিশ দিন এতেকাফের জন‌্য গমন করেন তখন হারুন (আ) কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যান । সিনাই উপত‌্যকায় থেকে তিনি বনী ইসরাঈলীদের রাফিদিনে পৌছেন । এ জায়গা থেকে হারুন (আ) আল-মারখাওতে যান যেখানে মান্নাহ ও সালওয়া নাজিল হয়েছিল । হারুন (আ) মূসা (আ) – এর ৩ বছর পূর্বে জন্মগহন করেন ।

 

হযরত যুলকিফল (আ)

কুরাআন মজীদে যুলকিফল নামটি দু’বার উল্লেখ হয়েছে । দু’বারাই অন‌্যান‌্য নীবদের সাথে তাঁর কথা উল্লেখ করা হয়েছে । একবার উল্লেখ হয়েছে সূরা সোয়াদে এভাবে : “ইসমাঈল, আল ইয়াসা আর যুলকিফল ছিলেন বনি ইসরাঈলের একজন নবী । কেউ কেউ বলেছেন তিনি ছিলেন আইয়ুব (আ) – এর পূত্র । “যুলকিফল” শব্দের অর্থ ভাগ‌্যবান । এটি ছিল তাঁর উপাধি । তাঁর মূল নাম ছিল ‘বিশর’ । তিনি বাইশ বছর যাবৎ বনি ইসরাঈলীদের মাঝে নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করেন ।

হযরত ইলিয়াস (আ)

ইলিয়াস (আ) জর্দানের জিলিয়াদ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি হারুন (আ) – এর বংশধর ছিলেন । তাঁর সম্বন্ধে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে – “নিঃসন্দেহে ইলিয়াছ রাসূলগণের অন্তর্ভুক্ত , যখন তিনি নিজ সম্প্রদায়কে বললেন, তোমরা কি সাবধান হবে না ? তোমরা বায়ালকে ডাকছো অথচ সর্বোত্তম স্রষ্টাকে পরিহার করছো ? সেই আল্লাহ যিনি তোমাদের এবং পূর্ব –পুরুষদেরও প্রভু ।” (সূরা আস-ছাফ্ফাত; আয়াত ১২৩-১২৬) । পবিত্র কুরআনে তাঁর নাম ৩ বার এসেছে । ঐতিহাসিক ও তাফসীরকারকদের মতে ৪ জন নবী এখানো জীবিত আছেন যারা হলেন ইদ্রিস (আ), খিজির (আ) , ইলিয়াস (আ) ও ঈসা (আ) । ইলিয়াস (আ) সিমেটিক জাতিকে হেদায়াত করার জন‌্য প্রেরিত হয়েছিলেন । তাঁর জাতি ইলিয়াস (আ) – এর দাওয়াতকে অগ্রাহ‌্য করে তাঁকে হত‌্যার পরিকল্পনা করে । তাঁর সম্প্রদায়ের ওপর দুর্ভিক্ষ নেমে আসে, এত রাজা ক্ষিপ্ত হয়ে ইলিয়াস (আ) কে হত‌্যার ষড়যন্ত্র শুরু করে ফলে আল্লাহ তাকে আসমানে উঠিয়ে নিয়ে যান বলে কোন কোন বর্ণনায় জানা যায় ।

 

হযরত আল ইয়াসা (আ)

আল ইয়াসা হলেন আল-ইসবাত ইবনে আদি ইবনে সাওতালম ইবনে আফ্রাছিম ইবনে ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব ইবনে ইসহাক ইবনে ইব্রাহিম খলিল (আ) । বলা হয় আল ইয়াসা’ (আ) ছিলেন ইলিয়াছ (আ) এর চাচাত ভাই (ইবনে কাসির) । তাঁর পিতার নাম ছিল সাফাত । কথিত আছে ইলিয়াছ (আ) যখন কাসিউন পাহাড়ে সংগোপনে অবস্থান করছিলেন, তখন আল ইয়াসা’ (আ) তাঁর সহযাত্রী ছিলেন । তাঁর জীবনের আরো উল্লেখযোগ‌্য ঘটনা হলোঃ আরীয়ার পানি ছিল ব‌্যবহারের অনুপযোগী । আল ইয়াসা’ (আ) সেই পানিতে লবণ নিক্ষেপ করলে পানি নির্মল ও সুপেয় হয়ে গিয়েছিল ।

 

 

হযরত দাউদ (আ)

দাউদ (আ) ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি ইয়াকুব (আ) এর ১২ পুত্রের মধ‌্যে ইয়াহুদার বংশধর ছিলেন । তিনি ছিলেন সুবক্তা ও সুমধুর কণ্ঠের অধিকারী । ৪০ বছর বয়সে তিনি নবওয়াত প্রাপ্ত হন । যথনি তিনি যাবুর কিতাব পাঠ করতেন তখন আকাবা উপসাগরের মাছ, আকাশের পাখি বনের পশু স্থির হয়ে আল্লাহর কিতাব শুনতো । আকাবা উপ-সাগরের তীসে বসে তিনি প্রতি শনিবার যাবুর কিতাব তিলাওয়াত করতেন । দাউদ (আ) ঐ এলাকায় মানুষকে শনিবারে মাছ ধরতে নিষেধ করেন । কিন্তু তারা শনিবারে বাঁধ দিয়ে মাছ আটকে রেখে অন‌্যদিন ধরতো । ফলে আল্লাহর গজবে তারা বানরে পরিণত হয় ।

পবিত্র রমজানে মাসের ১২ তারিখ তাঁর ওপর যাবুর কিতাব অবতীর্ণ হয় । তিনি পশু –পাখির ভাষা বুঝতেন । হযরত দাউদ –ই (আ) প্রথম যিনি একাধারে রাসূল এবং সুদক্ষ রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন । তারঁ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন – ‘হে দাউদ, ভূ-পৃষ্ঠে আমি তোমাকে আমার খলিফা নিযুক্ত করেছি । অতঃএব তুমি লোকদের মধ‌্যে সুবচিার কর এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না  ।’ (সূরা ছোয়াদ, আয়াত : ২৬) তিনি মূসা (আ) এর শরিয়ত পুনঃজীবিত করেন । পাশ্চাত‌্যের পণ্ডিতদের কাছে তিনি শরহম উবারফ নামে পরিচিত । তাঁর সময়ে Demography শাস্ত্রের আর্বিভাব ঘটে, তিনিই প্রথম পৃথিবীতে মানুষ গণনা বা আদমশুমারী শুরু করেন । তিনিই প্রথম রাষ্ট্রীয়  Treasury গঠন করেন তাঁর তত্ত্বাবধানে যুদ্ধাস্ত্র তৈরির প্রচল শুরু হয় । জেরুজালেমে একটি উঁচু টাওয়ার নির্মাণ করেন যেখানে উঠলে মরু সাগর এবং জর্দান নদী দেখা যেত ।

 

হযরত সুলাইমান (আ)

 

সুলাইমান (আ) খ্রিষ্টপূর্ব ১০৩৫ অব্দে জেরুজালেমে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি ছিলেন দাউদ (আ) এর সুযোগ‌্য পুত্র । বায়তুল মাকদাস যা সুলাইমান (আ) পুনঃনির্মাণ করেন । বায়তুল মাকদাসের দৈর্ঘ‌্য ৬০ হাত এবং প্রস্থ ২০ হাত , উচ্চতা ৩০ হাত ছিল । সুলাইমানকে আল্লাহতায়ালা জীনকে বশীভূত করার ক্ষমতা দান করেছিলেন । এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর বশীভূত করে দেয়া হয়েছে অবাধ‌্য জ্বীনকে, যে সর্বপ্রকার কর্ম সমাধানকারী, ইমারাত নির্মাণকারী এবং সমুদ্রে ডুবরী রূপে ।” (সূরা ছোয়াদ আয়াত : ৩৭ )

মাসজিদুল আকসার পুনঃ নির্মাণে ৩০,০০০ শ্রমিক সাত বছর যাবৎ পরিশ্রম করেন । তাঁর শাসনকালে খনি বিদ‌্যার সূচনা হয় ।

 

হযরত ইউনুস (আ) ইউনস (আ) ইরাকের নিনেয়া শহরে যার বর্তমান নাম মসুল, বাগদাদ থেকে ৩৯৬ কিঃ মিঃ উত্তরে ফোরাত নদীর তীরে খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭২ সালে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতার নাম আসতাহ । তিনি ২৮ বছর বয়সে নবুওয়াতের দায়িত্ব পান । নিনোয়াবাসী যখন ইউনুস (আ) – এর কথা অমান‌্য করে আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত ছিল এবং পয়গাম্বরেরকথা ঠাট্রা – বিদ্রুপ করছিল তখন তিনি বদদোয়া করে অন‌্যত্র চলে যাচ্ছিলেন । যাবার কালে ফোরাত নদীর তীরে নৌকায় উঠার পর প্রচণ্ড ঝড় তুফান শুরু হলো । তখন যাত্রীরা লটারীর সাহায‌্যে ইউনুস (আ) নবীকে দায়ী করে নদীতে নিক্ষেপ করলেন । আল্লাহর হুকুমে নদীর মাছ তাঁকে গিলে ফেলেছিল । যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে মাছের পেটে তিনি জীবিত আছেন তখন তিনি আল্লাহর কাছে এস্তেগফার ও তাসবীহ পাঠ শুরু করলেন । আর আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন । পরে মাছ তাঁকে মুখ দিয়ে উগরিয়ে নদীর তীরে ফেলে দিল । তিনি সেখানে একখানা কুঠুরি নির্মাণ করে কিছু দিন বসবাস করেন এবং আল্লাহর নির্দেশে পুনরায় মসুলে ফিরে যান । এ ব‌্যাপারে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন পাকে বলেনঃ “আর ইউনুস অবশ‌্যই প্রেরিত পুরুষদের অন‌্যতম ।” – সূরা আস সাফফাত : ১৩৯

 

হযরত যাকরিয়া (আ)

যাকারিয়া (আ) প্রায় ২১০০ বছর পূর্বে ফিলিস্তিনে বনি ইসরাঈল গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি সুলাইমান ইবনে দাউদ (আ) এর বংশধর ছিলেন, তার স্ত্রী ইশা বা আল ইয়শ হারুন (আ) এর বংশীয় ছিলেন । ইয়াহইয়া (আ) এর পিতা এবং নবী ঈসা (আ) এর খালু যাকারিয়া বায়তুল মাকদাসের রক্ষণাবেক্ষণাকরী এবং নবী ঈশা (আ) এর মাতা মারাইয়ামের লালন পালন করতেন । যাকারিয়া (আ) সম্পর্কে কুরআন শরীফে আল্লাহ বলেন – “আরো দান করেছি যাকারিয়া , ইয়াহইয়া, ঈসা এবং ইলিয়াসকে  । তারা সবাই পুণ‌্যবানদের অন্তর্ভুক্ত ছিল ।” (সূরা আনয়াম, আয়াত : ৮৫ )ইয়াহুদীদের আক্রমণের মুখে তিনি একটি বৃক্ষের মাঝে আশ্রয় গ্রহণ করেন কিন্তু তার জামার একটি অংশ বাইরে থাকায় আল্লাহর দ্বীনের শত্রুরা গাছটি করাত দ্বারা দ্বিখণ্ডিত করলে তিনি শাহাদাৎ বরন করেন ।

 

হযরত ইয়াহইয়া (আ)

 

পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, “হে যাকারিয়া আমি নিঃসন্দেহে তোমাকে সুসংবাদ প্রদান করছি এক পুত্রের , তার নাম হবে ইয়াহইয়া । পূর্বে আর কারো জন‌্য এ নাম নির্ধারিত করিনি ।” (সূরা মরিয়াম , আয়াত : ৭ ) যাকারিয়া (আ) এর দোয়ার বরকতে বন্ধ‌্যা মাতার গর্ভে খ্রিষ্টপূর্ব ১ সালে জন্মগ্রহণ করেন ইয়াহইয়াহ (আ) । তিনি ঈসা (আ) – এর খালাত ভাই ছিলেন  । তিনি বেশির ভাগ সময় নির্জনে খোদার প্রেমে কান্নাকাটি করে কাটাতেন । তিনি ইয়ারদান নদীর তীরে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দিতেন । ইয়াহইয়া (আ) মানুষকে ৫টি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে – ১. আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করা,

২. সালাত আদায় করা,

৩. রোজা পালন করা,

৪. অধিক পরিমাণ আল্লাহর যিকির করা,

৫. দান সাদকা করা ।

 

হযরত ঈসা (আ)

বায়তুল লাহম, যেখানে আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে ঈসা (আ) জন্মগ্রহণ করেন । ঈসা আরবি শব্দ । হিব্রু ভাষা Joshuna এর অর্থ হলো ত্রাণকর্তা । গ্রীক ভাষায় বলা হয়  Christ  । মাসীহ তাঁর উপাধি । এর অর্থ স্পর্শ করা । কারণ ঈমা (আ) রুগণ রোগীকে স্পর্শ করা মাত্রাই সুস্থ হয়ে যেত । ঈসা (আ) মারাইয়ামের গর্ভে আল্লাহর কুদরতে পিতা ছাড়া জন্মগ্রহণ করেন । ঈসা (আ) এর ৫টি মুজেজা ছিলঃ

১. তিনি আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করতে পারতেন ।

২. মাটির তৈরি পাখিকে ফুঁ দিলে তা আল্লাহর হুকুমে  ‍উড়ে যেত ।

৩. অন্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকে ফুঁ দিলে তা আল্লাহর কুদরতে ভাল হয়ে যেত ।

৪. মানুষ তাদের ঘরে যে খাদ‌্য খেতে তা বলে দিতে পারতেন ।

৫. ঈসা (আ) এর সঙ্গীদের অনুরোধ আল্লাহর কুদরতে আকাশ থেকে খাদ‌্য ভরা পাত্র নাজিল হত ।

তিনি ৩০ বছর বয়সে নবুওয়াতের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন । তাঁর ওপর ইনজিল কিতাব নাজিল হয় । বনি ইসরাঈলগণ তাঁকে শূলে চড়িয়ে হত‌্যা করতে চেয়েছিল । আল্লাহ তাদের চক্রান্ত নস‌্যাৎ করে দিয়ে মাত্র ৩২ বছর বয়সে তাঁকে ঊর্ধ্ব জগতে নিয়ে যান ।

হযরত রাসূলুল্লাহ (সা)

 

মানবতার বন্ধু সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) আরবের মক্কা নগরীতে মাতা আমিনার কোলে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন । জন্মের আগেই পিতা আব্দুল্লাহ মৃত‌্যুবরণ করেন । ৫ বছর বয়স পর্যন্ত দুধ-মা হালিমার কাছে থাকেন । অতঃপর পিতৃব‌্য আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন । মক্কায় শান্তির জন‌্য ১৭ বছর বয়সে হিলফুল ফুযুল নামক শান্তি সংঘ গঠন করেন  । অতঃপর ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে নবুওয়াতে লাভ করেন ।

কাফিরদের অত‌্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নবুওয়াতের ৫ম বর্ষে প্রথম পর্বে  ১৬ জন মুসলমান আবিসিনিয়া (ইথিওপিয়া) হিজরত করেন এবং দ্বিতীয় দফায় আরো হিজরত করেন ৮৩ জন মুসলমান । এ সময় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা কুরাইশ নেতা উমর (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন । প্রথমবারের মত মুসলমানেরা কাবা প্রাঙ্গণে প্রকাশ‌্যে সালাত আদায় করেন । ৪৭ বছর বয়সে শিয়াবে আবুতালিবের অবরোধ জীবন শুরু হয় এবং ৪৯ বছর বয়সে সমাপ্তি ঘটে । তিনি নবওয়াতের ১০ম বর্ষে ইসলাম প্রচারের জন‌্য তায়েফ গমন করেন । তায়েফবাসী ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় এবং নির্মম নির্যাতন করে । ৫১ বছর বয়সে নবুওয়াতের ১২ বর্ষে আকাবা নামক স্থানে ১২ জন মদীনাবাসী বাইয়াত গ্রহণ করেন । তিনি ৫২ বছর বয়সে আয়েশা (রা) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ।

অতঃপর সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় কাফেরদের অত‌্যাচারে আল্লাহর হুকুম ৬২২ খ্রিস্টাব্দে আবুবকর (রা) কে সাথে নিয়ে মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় আসেন । তিনি বিশিষ্ট সাহাবী আবু আইয়ুব আনসারীর বাড়িতে ওঠেন । বানুনা উপত‌্যকায় বনী সালেম পল্লীতে ১০০ জন সাহাবী নিয়ে সর্বপ্রথম জুমার নামায আদায় করেন ।

৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে কাফিরদের সাথে ১৭ রমজান বদর যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় । ৩১৩ জন সাহাবী নিয়ে রাসূল (সা) কাফিরদের মুকাবেলায় বিজয় লাভ করেন । ৩য় হিজরি ১১ শাওয়াল বিখ‌্যাত ওহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং রাসূল (সা) এর চাচা হামযা (রা) সহ ১৭ জন মুসলিম সৈনিক শাহাদত বরণ করেন । ৪ হিজরিতে সফর মাসে ‘বীর মাউনা’ নামাক স্থানে ৬৮ জন ইসলাম প্রচারক সাহাবীকে কাফিররা নির্মমভাবে হত‌্যা করে । মহানবী (সা) কে হত‌্যা প্রচেষ্টার অপরাধে রবিউল আউয়াল মাসে বনু নাযিল গোত্রকে মদীনা প্রজাতন্ত্র থেকে বহিস্কার করা হয় । ষষ্ঠ হিজরিতে তিনি হজব্রত পালনের উদ্দেশ‌্যে ১৫ শত সাহাবী নিয়ে মক্কার দিকে যাত্রা শুর করেন । এবং হুদাইবিয়া নামক স্থানে মক্কায় কাফিররা বাধা প্রদান করে । সেকানে ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হয় । ৮ম হিজরিতে যায়িদ ইবনেহারিসার নেতৃত্বে সিরিয়ায় একদল সৈন‌্য প্রেরিত হয় । জামাদিউল আউয়াল মাসে সিরিয়ার খ্রিষ্টান নেতা শোরাহবীলের বাহিনীর সাথে ‘মুতা’নামক স্থানে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হ । এই যুদ্ধে মুসলিম সেনাপতি যায়িদ ইবনে হারিসা, জাফর ইবনে আবু তালিব ও আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা শাহাদত বরণ করেন । ৮ম হিজরি (২০ রমজান) ৬২ বছর বয়সে ১০ হাজার মুসলিম সৈন‌্য নিয়ে মহানবী (সা) বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় করেন । ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার ৬৩ বছর বয়সে মহানবী (সা) ইন্তেকাল করেন । ১৪ রবিউল আউয়াল রাসূল (সা) এর দাফন সম্পন্ন হয় ।